পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর – ২ ব্লকের স্নিগ্ধ সবুজে ঘেরা শ্রীরামপুর গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এক নিরব কিন্তু শক্তিশালী ইতিহাস – শ্রীরামপুর হরপ্রসাদ (HP) হাই স্কুল। এই বিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের একটি ভবন নয়, এটি হাজারো স্বপ্নের জন্মস্থান, অসংখ্য জীবন গড়ার কারখানা এবং গ্রামীণ শিক্ষার এক অবিচল অভিভাবক।
ঐতিহ্যের শুরু: ১৯৫২ সালের এক স্বপ্ন
১৯৫২ সালে যখন এই বিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয়, তখন শ্রীরামপুর ও আশপাশের এলাকায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই সময় কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবীর একটাই স্বপ্ন ছিল – গ্রামের ছেলেমেয়েরা যেন শহরে না গিয়েও মানসম্মত শিক্ষা পায়। সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয় স্রীরামপুর হরপ্রসাদ হাই স্কুল।
প্রথম দিকে সীমিত পরিকাঠামো, কম শিক্ষক এবং অল্পসংখ্যক ছাত্রছাত্রী নিয়ে শুরু হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্কুল পরিণত হয়েছে এলাকার অন্যতম নির্ভরযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আজ প্রায় সাত দশক ধরে বিদ্যালয়টি নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে চলেছে।
সহশিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের মিলনস্থল
শ্রীরামপুর হরপ্রসাদ হাই স্কুল একটি সহশিক্ষা বিদ্যালয়, যেখানে ছেলে ও মেয়ে – উভয়েই সমান গুরুত্ব ও সুযোগ পায়। এখানে কেবল পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, শেখানো হয় সহানুভূতি, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা।
এই বিদ্যালয়ের পরিবেশ এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে ছাত্রছাত্রীরা ভয় নয়, ভালোবাসার সঙ্গে শিখতে পারে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা কেবল পড়ান না, তাঁরা অভিভাবকের মতো আগলে রাখেন।
পঞ্চম থেকে দ্বাদশ: একটানা শিক্ষার নির্ভরতা
বিদ্যালয়টিতে পঞ্চম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ একজন ছাত্র বা ছাত্রী প্রাথমিকের পর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত একই প্রতিষ্ঠানে থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করতে পারে। এর ফলে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতি আরও মজবুত হয়।
শিক্ষার মাধ্যম বাংলা, যা গ্রামীণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে শিক্ষাকে আরও সহজ ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলে।
রাজ্য স্বীকৃতি ও বোর্ডের অন্তর্ভুক্তি
শ্রীরামপুর হরপ্রসাদ হাই স্কুল পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) এবং পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ (WBCHSE)-এর অধিভুক্ত। পাশাপাশি বিদ্যালয়টি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা দপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি রাজ্য–সহায়তাপ্রাপ্ত স্কুল।
এই স্বীকৃতি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রমাণ বহন করে।
শ্রেণিকক্ষ থেকে গ্রন্থাগার: জ্ঞানের বিস্তৃত পরিসর
বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১১টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে, যেখানে সুশৃঙ্খল ও মনোযোগী শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা হয়।
এছাড়াও রয়েছে একটি লাইব্রেরি, যেখানে প্রায় ১,৪০০টিরও বেশি বই সংরক্ষিত। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও জীবনঘনিষ্ঠ বই ছাত্রছাত্রীদের চিন্তার জগৎ প্রসারিত করে।

ডিজিটাল শিক্ষার পথে: কম্পিউটার ল্যাব
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যালয়ে রয়েছে কম্পিউটার-সহায়িত শিক্ষার ব্যবস্থা। গ্রামীণ পরিবেশে থেকেও ছাত্রছাত্রীরা যেন ডিজিটাল দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে – এই লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে কম্পিউটার ল্যাব।
এখানে ছাত্রছাত্রীরা প্রাথমিক কম্পিউটার জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে শেখে।

Atal Tinkering Lab: ভবিষ্যৎ উদ্ভাবকদের আঁতুড়ঘর
শ্রীরামপুর হরপ্রসাদ হাই স্কুলের অন্যতম গর্ব হলো Atal Tinkering Lab (ATL)। এই ল্যাব ছাত্রছাত্রীদের কেবল পরীক্ষার জন্য পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং তাদের চিন্তা করতে শেখায় – “কেন” এবং “কিভাবে”।
ডিজিটাল ফ্যাব্রিকেশন, ইলেকট্রনিক্স, রোবোটিক্স ও উদ্ভাবনী প্রকল্পের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা এখানে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পায়। গ্রাম থেকে উঠে আসা বহু ছাত্রছাত্রী এখানেই প্রথম প্রযুক্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়।
স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও মানবিক যত্ন
বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার দিকেও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।
- ছেলেদের জন্য ৫টি পৃথক শৌচালয়
- মেয়েদের জন্য ৩টি পৃথক শৌচালয়
- বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা
এসবের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা হয়।
মিড-ডে মিল: শিক্ষার সঙ্গে পুষ্টির বন্ধন
বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল প্রকল্প চালু রয়েছে, যেখানে খাবার বিদ্যালয়ের নিজস্ব রান্নাঘরেই প্রস্তুত হয়। অনেক দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য এই একবেলা খাবার শুধু পুষ্টির উৎস নয়, স্কুলে নিয়মিত আসার অন্যতম প্রেরণা।
এই ব্যবস্থার ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক বিকাশও নিশ্চিত হয়।
খেলাধুলা ও মাঠ: শরীর ও মনের বিকাশ
বিদ্যালয়ে রয়েছে একটি নিজস্ব খেলার মাঠ, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা ফুটবল, দৌড়, কাবাডি সহ বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করে। খেলাধুলা তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা, দলগত মানসিকতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।

সকলের জন্য শিক্ষা: হুইলচেয়ার–সহযোগী পরিকাঠামো
বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ ও পার্কিং এলাকা হুইলচেয়ার–সহযোগী, যা বিশেষভাবে সক্ষম শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়কে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে। এটি প্রমাণ করে—এই স্কুলে শিক্ষা সবার জন্য।
অবস্থান ও সময়সূচি
ঠিকানা:
গ্রাম শ্রীরামপুর, ডাকঘর শ্রীরামপুর,
ব্লক পটাশপুর–২, জেলা পূর্ব মেদিনীপুর,
পশ্চিমবঙ্গ – ৭২১৪৪০
বিদ্যালয়ের সময়সূচি:
- সোমবার – শুক্রবার: সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা
- শনিবার: সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা
- রবিবার: বন্ধ
উপসংহার: ভবিষ্যতের পথে এক দৃঢ় পদচারণা
শ্রীরামপুর হরপ্রসাদ (HP) হাই স্কুল আজও নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে—আলো জ্বালানোর কাজে। এখানে পড়াশোনা করা প্রতিটি ছাত্রছাত্রী শুধু পরীক্ষায় পাশ করে না, তারা জীবনযুদ্ধে লড়ার শক্তি অর্জন করে।
গ্রামবাংলার বুকে দাঁড়িয়ে এই বিদ্যালয় প্রমাণ করেছে—স্বপ্ন দেখতে শহরে যেতে হয় না, যদি শিক্ষার ভিত মজবুত হয়।
শ্রীরামপুর হরপ্রসাদ হাই স্কুল তাই শুধু একটি স্কুল নয়—এটি এক চলমান ইতিহাস, এক জীবন্ত আশা, আর অসংখ্য ভবিষ্যতের সূচনা। শ্রীরামপুর হরপ্রসাদ হাইস্কুল









2 thoughts on “শ্রীরামপুর হরপ্রসাদ (HP) হাইস্কুল: গ্রামবাংলার বুকে শিক্ষার এক দীপ্তমান আলোকস্তম্ভ”